Friday, 10 May 2013

পুরুষদের মেদ-ভুঁড়ি



মেদ-ভুড়ি নিয়ে আর হাসি-তামাশা করা যাচ্ছে না। আগে ভুঁড়ি সম্পদ এবং আভিজাত্যের পরিচয় বহন করতো। ভুঁড়িদার ব্যক্তিদের খাওয়াদাওয়া নিয়ে কিছু রসিকতাও করা হতো। কিন্তু আজকাল ভুঁড়ি একেবারে বেমানান বিষয়।  তারপরেও আমাদের অনেকের ভুঁড়ি বড় হচ্ছে, ভুঁড়িদারদের কাফেলা লম্বা হচ্ছে। এটা মোটেও সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়। পেটে প্রতি কেজি অতিরিক্ত চর্বি জমার মানে স্বাস্থ্যের ওপর ক্রমশ হুমকি বেড়ে যাওয়া।  
মহিলাদের চেয়ে পুরুষদের পেটে চর্বি জমা হওয়ার প্রবণতা বেশী। কারো ওজন যাই হোক না কেন, পেটে অতিরিক্ত চর্বি জমা নানা রকম স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করে; যেমন-
  • হৃদরোগ
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • মস্তিস্কের পক্ষাঘাত
  • বিভিন্ন ধরণের ক্যানসার
  • ডায়াবেটিস মেলিটাস ( টাইপ-২)
  • ইনসুলিন প্রতিরোধ্যতা বেড়ে যাওয়া
  • রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়া
  • কম ঘনত্বের ভালো কোলেস্টেরল কমে যাওয়া
  • বিপাকজনিত সমস্যা (Metabolic syndrome)
  • ঘুমের মধ্যে বার বার দম বন্ধ হয়ে যাওয়া (Sleep apnoea)
অনেকে জানতে চান- পেটে অতিরিক্ত চর্বি জমেছে কিনা তা কেমন করে বোঝা যাবে।  সাধারণত কটিদেশ এবং কোমরের মাপ নিয়ে তার অনুপাত নির্ণয় করলে এটা বোঝা যায়। আরেকটি সহজ উপায় হচ্ছে শরীরের ঘনত্ব সূচক (Body mass index - BMI) নির্নয় করা। তবে যে কারো কটিদেশের মাপ (Waist size) জানলেই আন্দাজ করা যায় তার অবস্থা কি? সাধারণত যাদের কটি ৪০ ইঞ্চির (১০২ সেঃমিঃ) বেশী তারা বিপদের মুখে রয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন চলে আসে- বয়সের সঙ্গে কি ভুঁড়ির কোন সম্পর্ক আছে? এর উত্তর হচ্ছে বয়স বাড়ার পাশাপাশি কেউ যদি শরীর চর্চা বা ব্যায়াম না করেন, তাহলে তার পেশী ক্ষয় হতে থাকে এবং এর ফলে শরীরের ক্যালরি খরচের পরিমাণ আরও কমে যায়। এজন্য বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ভুঁড়ি বাড়তে থাকে।
স্থূলকায়তা কিংবা অতিরিক্ত ওজনের জন্য অনেকে বংশগতি বা জিনকে দায়ী করে থাকেন। তবে বংশগতি বা জিন যত না ওজন বাড়ার জন্য দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশী দায়ী আমাদের জীবনাচরণ বা লাইফ স্টাইল। সাধারণত যারা শারীরিক পরিশ্রম কম করে এবং বেশী খায়- তারাই মোটা হয়। তাদেরই ভুঁড়ি বাড়ে। অতিরক্ত মদ্যপান বিশেষত বিয়ার সেবন করাকেও ভুঁড়ি হওয়ার জন্য দায়ী করা হয়। অতিরিক্ত বিয়ার সেবন করলে প্রচুর চর্বি জমে যায়। অতএব যারা ভুঁড়ি কমাতে চান তাদের এ বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেমন করে ভুঁড়ি কমাবো?
ভুঁড়ি কমানো আর শরীরের ওজন কমানোর মূল সূত্র একই- ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ কমাতে হবে আর শারীরিক পরিশ্রমের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
ক্যালরি গ্রহণ কমানোর সহজ কোন বুদ্ধি নেই। তবে কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে-
  • ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ কমাতে হবে।
    • পাতে খাবারের পরিমাণ কম নিতে হবে
    • তেল-চর্বির পরিবর্তে শাকসবজি-ফলমূল বেশী খেতে হবে
    • ফাস্ট ফুড যত কম খাওয়া যায়, ততই মঙ্গল
    • রেস্টুরেন্টে যত কম খাওয়া যায় ততই মঙ্গল
    • রেস্টুরেন্টে যেয়ে অন্যদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খেলে কম খাওয়া হবে।
  • শারীরিক পরিশ্রম বাড়াতে হবে।
    • সুস্বাস্থ্যের জন্য আমাদের প্রত্যেকের প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে আড়াইঘণ্টা  (১৫০ মিনিট) মাঝারী মানের শারীরিক ব্যায়াম করা উচিত অথবা ৭৫ মিনিট ভারী ব্যায়াম করা যেতে পারে। যারা ওজন কমাতে চান তাদের এর চেয়ে বেশী ব্যায়াম করতে হবে এবং তা নিয়মিত চর্চা করতে হবে।
    • যাদের পক্ষে একটানা বেশী সময় ব্যায়ামের ফুরসৎ নেই, তারা কাজের ফাঁকে ফাঁকে অল্পসময়ে কিংবা বার বার ব্যায়াম করতে হবে।
    • নৈশ ভোজের পর অবশ্যই কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতে হবে।
    • একবার ওজন সঠিক মাত্রায় নিয়ে আসতে পারলে তা বজায় রাখার জন্য যথাযথ খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়াম চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে।
সবশেষ কথা হচ্ছে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে অতিরিক্ত মেদ-ভুঁড়ি কমানো সম্ভব। প্রয়োজন একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা এবং ধৈর্য। কয়েক কেজি ওজন কমাতে পারলেই তা চিত্তকে প্রফুল্ল করে এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি বহুলাংশে লাঘব করে।   




Thursday, 9 May 2013

অ্যান্ড্রোপজ-পুরুষত্বের ইতি




বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরে হরমোনের মাত্রা পরিবর্তিত হতে থাকে। মেয়েদের নিয়মিত রজঃস্রাবের জন্য দায়ী যে সকল হরমোন, সাধারণত ৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সে তা সহসা কমে যায় এবং রজঃনিবৃত্তি ঘটে। ইংরেজীতে একে মেনোপজ (Menopause) বলা হয়। পুরুষদের বেলায় পুরুষত্বের জন্য দায়ী হরমোনের মাত্রা এমন সহসা কমে যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে এর মাত্রা কমতে থাকে এবং এই পরিবর্তন কয়েক বছর ধরে চলে। এক পর্যায়ে পুরুষত্বের অনেক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়। এক কোথায় একে পুরুষদের মেনোপজ বলা যায়। অধিকাংশ চিকিৎসা বিজ্ঞানী পুরুষত্বের বৈশিষ্ট্যসমূহ লোপ পাওয়াকে অ্যান্ড্রোপজ (Andropause) বলে থাকেন।

পুরুষত্বের জন্য দায়ী মূল হরমোন টেস্টোস্টেরন।টেস্টোস্টেরন শরীরে কমে যাওয়ার কারণে আন্ড্রোপজ হয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে মেনোপজ বা রজঃস্রাব নিবৃত্তি হলে ডিম্বস্ফোটন(Ovulation) বন্ধ হয়ে যায়। আর নিয়মিত মাসিক রজঃস্রাব হয় না। এ পরিবর্তনগুলি খুবই দৃশ্যমান । পাশাপাশি রজঃনিবৃত্তির জন্য মহিলাদের নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে থাকে। অনেক মহিলা রজঃনিবৃত্তির শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন তীব্রভাবে অনুভব করেন; এমন কি এজন্য তারা চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে বাধ্য হন। আবার অনেকে এ সকল পরিবর্তন তেমন আমলে নেন না এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। পক্ষান্তরে পুরুষদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমতে থাকে। ফলে টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি সহসা তেমনভাবে দৃশ্যমান হয় না। এজন্য অ্যান্ড্রোপজ কখন ঘটে যায় তা অনেক পুরুষই উপলব্ধি করতে পারেন না। কিন্তু টেস্টোস্টেরন হরমোনের অভাবে পুরুষের যৌন চাহিদা, মানসিক শক্তি ইত্যাদি ক্রমশ পরিবর্তিত হতে থাকে। এ সকল পরিবর্তন সকলের অগোচরে ঘটে বিধায় তা সরাসরি দৃশ্যমান হয় না।

ব্যক্তিবিশেষে পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রার ব্যাপক ভিন্নতা দেখা যায়। কম বয়সী যুবকদের চেয়ে স্বাভাবিকভাবে বয়স্ক পুরুষদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম থাকে। বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমতে শুরু করে। গড় পড়তা ৩০ বছর বয়স হওয়ার পরে এর মাত্রা প্রতিবছর ১% করে কমে; সাধারণত ৭০ বছর বয়স্ক পুরুষের শরীরে এর মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অর্ধেক কমে যায়। কারও কারও এ মাত্রা আরও কমে যেতে পারে। স্বভাবত একজন পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বয়স বাড়ার জন্য কমেছে, নাকি অন্য কোন রোগ-ব্যাধির জন্য কমেছে তা মুল্যায়ন করার প্রয়োজন রয়েছে। উপযুক্ত চিকিৎসা না করলে অনেক কারণেই টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যায়; যেমনঃ নিদ্রাকালীন শ্বাস আবদ্ধতা (Obstructive sleep apnoea)

একটা প্রশ্ন সকলের মনেই জাগতে পারে-কেমন করে বুঝব শরীরে টেস্টোস্টেরনের  মাত্রা কমেছে কিনা? সাধারণত অনেক পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে গেলেও তেমন কোন লক্ষণ-উপসর্গ প্রকাশ পায় না। আবার অনেকের নানা রকম লক্ষন-উপসর্গ দেখা যায়। যেমনঃ

  • পুরুষের স্বাভাবিক যৌনাচরণের পরিবর্তন। টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে পুরুষের যৌন চাহিদা হ্রাস পায়; এমনকি নপুংশতা দেখা দিতে পারে।অনেকের অণ্ডকোষ দুটি আকারে-আকৃতিতে ছোট হয়ে যায় এবং যৌন দুর্বলতা দেখা দেয়।
  • ঘুমের পরিবর্তনঃ টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার ফলে অনেক পুরুষের ঘুমের ধরণ বদলে যায়। আবার অনেকে নিদ্রাহীনতায় ভুগতে পারেন।
  • শারীরিক পরিবর্তনঃ  টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমার ফলে পুরুষের শরীরে নানাবিধ পরিবর্তন ঘটে থাকে। যেমন- শরীরে চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়, পেশীর পরিমাণ কমে যায় এবং ভারী শারীরিক কসরত করার ক্ষমতা কমে যায়। এ ছাড়া হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়। অনেক পুরুষের স্তন বৃদ্ধি ঘটে এবং তা ব্যথাযুক্ত হতে পারে। অনেকের মাথার চুল পড়ে যায় এবং টাক দেখা যায় এবং কেউ কেউ হঠাৎ হঠাৎ শরীরে উত্তাপের ঝলক সৃষ্টি হয় বলে অনুভব করে থাকেন।
  • মানসিক পরিবর্তনঃ টেস্টোস্টেরনের পরিমাণ কমার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষের কর্মস্পৃহা অনেক কমে যায়। কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলার পাশাপাশি অনেকে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। যৌবনের যে উৎসাহ-উদ্দীপনা, মনের জোর, সব জয় করার এক উদগ্র বাসনা; টেস্টোস্টেরনের পরিমাণ কমার ফলে তা কোথায় যেন উবে যায়। অনেকে কোন কাজে একভাবে মনঃসংযোগ করতে পারেন না, স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে; এমনকি অনেকে বিভিন্ন মাত্রার বিষণ্ণতায় ভুগতে পারেন।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, বয়স বাড়ার ফলে এ সকল শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই ঘটতে পারে। তবে অনেক সময় অন্যান্য শারীরিক অসুখ-বিসুখ যেমনঃ থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা, বিষণ্ণতা রোগ, অতিরিক্ত মদ্যপান ইত্যাদি কিংবা ওষুধ সেবনের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হিসাবেও এ রকম হতে পারে। সুতরাং একজন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যুক্তিসঙ্গত।

মহিলাদের রজঃনিবৃত্তি কোন রোগ নয়; এটা জীবনের একটি স্বাভাবিক অমোঘ পরিবর্তন। একদিন কিশোরী যেমন রজঃস্রাব শুরুর মাধ্যমে নারীতে পরিণত হন, তেমনি রজঃনিবৃত্তির মাধ্যমে তিনি জীবনে প্রৌঢ়ত্বের অন্য এক স্তরে উপনীত হন।  নারী জীবনে রজঃস্রাব শুরু হওয়া যেমন কোন অসুখ নয়, রজঃস্রাবের নিবৃত্তিও তেমন কোন ব্যাধি নয়। একই ধারাবাহিকতায় পুরুষের পরিণত বয়সে টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার ফলে পুরুষত্বের ইতি বা অ্যান্ড্রোপজও কোন অসুখ নয়। এটি জীবনের একটি পরিবর্তিত ধাপ বা পর্যায় মাত্র। এটাকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিয়ে জীবনের এই নতুন পর্যায়টিকে উপভোগ করা এবং আনন্দমুখর করে তোলা আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। তবে এ পরিবর্তন সম্পর্কে কোন সংশয় থাকলে কিংবা টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়া নিয়ে কোন সন্দেহ থাকলে, অবশ্যই চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হতে হবে। শেষ বয়সে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পুনরায় টেস্টোস্টেরন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে কতগুলি বিষয় খেয়াল রাখা উপকারীঃ
  • ·      চিকিৎসকের সঙ্গে এ বিষয়ে সরাসরি কথা বলা উত্তম। সমস্যাগুলি যদি বয়স বাড়ার কারণে না হয়ে অন্য কোন অসুখ-বিসুখ কিংবা ওষুধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার কারণে হয়, তাহলে তার সমাধান করা যেতে পারে।
  • ·      জীবনাচরণ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। যেমন- স্বাস্থ্যকর এবং পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম ও শরীর চর্চা করা ইত্যাদি। সুস্থ জীবনাচরণ  শারীরিক শক্তি ও মানসিক উদ্দীপনা বৃদ্ধির জন্য সহায়ক।
  • ·   বিষণ্ণতার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। আগেই বলা হয়েছে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে পুরুষের কর্মস্পৃহা, মানসিক উৎসাহ-উদ্দীপনা অনেক হ্রাস পায়। এছাড়া বিষণ্ণতার কারণে অনেকের মেজাজ খিট খিটে হয়ে যায়, নিঃসঙ্গ থাকতে পছন্দ করেন এবং সামাজিক কর্ম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত কাজ করার প্রবণতা, অতিরিক্ত নেশা করা কিংবা বিপজ্জনক কাজকর্ম করাও বিষণ্ণতার কারণে হতে পারে।
  • ·         বনজ ওষুধ সেবনের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এটা খুবই পরিস্কার যে বয়স বাড়ার ফলে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে তা গাছগাছড়ার কিংবা পাতার রস খেয়ে বাড়ানো যায় না। অনেকক্ষেত্রেই এসকল বনজ ওষুধের কার্যকারীতার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এগুলি সেবন করে যকৃত কিংবা কিডনি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
  • ·         অনেকে ক্ষেত্রে  টেস্টোস্টেরন প্রতিস্থাপন চিকিৎসায় অনেকে উপকৃত হয়ে থাকেন। তবে এর কার্যকারীতা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। অতএব একজন উপযুক্ত চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত এরকম ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।

Wednesday, 8 May 2013

পুরুষদের কয়েকটি স্বাস্থ্য সমস্যা



আজকাল স্বাস্থ্য সেবার একটি বড় অংশ মা ও শিশুর স্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে । সহস্রাব্দ লক্ষ্যের প্রধান অংশ জুড়ে রয়েছে মায়েদের স্বাস্থ্য এবং শিশুদের স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়ন। এতসব প্রচেষ্টা এবং প্রচার-প্রচারণার ভীড়ে বাবাদের স্বাস্থ্য বা পুরুষদের স্বাস্থ্য সমস্যার বিষয়টি আমরা অবহেলা করছি কিনা তা ভেবে দেখার সময় এসেছে । কারণ মহিলা ও শিশুদের বিষয়ে সকলে যতটা সহানুভূতি এবং আগ্রহ সহকারে স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করেন , বাড়ীর কর্তাটির কথা সেখানে আজকাল অনেক সময় কারও মনে থাকে না। আর নারীদের অধিকার আন্দোলনের প্রবল স্রোতের তোড়ে বেচারা পুরুষরা তাদের স্বাস্থ্যের কথা ভুলতে বসেছে কিনা সেটাও লক্ষ্য রাখতে হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে পুরুষদের স্বাস্থ্য সমস্যা কি? সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (Center for disease control and prevention)  পুরুষদের স্বাস্থ্য  সমস্যার একটি তালিকা করেছে। পুরুষদের স্বাস্থ্য সমস্যার তালিকাটি কিন্তু অবাক হওয়ার মতো ছোট। সেখানে পুরুষদের শত্রু হিসাবে প্রধান সাতটি রোগ-ব্যাধিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সাত রকমের রোগ-ব্যাধির প্রতি নজর দিলে এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করলে পুরুষ প্রজাতির সুস্বাস্থ্য এবং কল্যাণ নিশ্চিত করা যাবে বলে আশা করা যায়।

১। হৃদরোগ

পুরুষের প্রধান শত্রু হৃদরোগ। অতএব সকল পুরুষকে হৃদরোগ প্রতিরোধ করার জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে। এজন্য-
  • ধূমপান পরিহার করতে হবে। হৃদপিণ্ডের অন্যতম প্রধান শত্রু ধূমপান। অতএব প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সব ধরণের ধূমপান পরিত্যাগ করতে হবে।
  • স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ। শাক-সবজী, ফলমূল, আকাঁড়া শস্য দানা, অতিরিক্ত আঁশযুক্ত খাদ্য ইত্যাদি বেশী বেশী খেতে হবে। কিন্তু সম্পৃক্ত চর্বি এবং লবণযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে।
  • ক্রনিক রোগ পরিহার করতে হবে। যেমন উচ্চ রক্তচাপ কিংবা ডায়াবেটিস হলে অবশ্যই তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
  • প্রতিদিন ব্যায়াম করতে হবে । নিয়মিত যে কোন ধরণের শরীরচর্চা কিংবা খেলাধুলা করতে হবে।
  • শরীরের ওজন সীমিত রাখতে হবে। অতিরিক্ত ওজন মানেই হৃদপিণ্ডের ওপর অতিরিক্ত বোঝা।
  • মদ্যপান পরিহার করতে হবে। অতিরিক্ত অ্যালকোহল রক্ত চাপ বাড়িয়ে দেয় এবং তা হৃদপিণ্ডের জন্য ক্ষতিকর।
  • মানসিক চাপ এবং উদ্বেগমুক্ত হতে হবে। সবসময় দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কাজেই মানসিক চাপ মুক্ত হাসিখুশি প্রাণবন্ত জীবন যাপনের চেষ্টা করতে হবে।

২। ক্যান্সার

হৃদরোগের পরে পুরুষের দ্বিতীয় প্রধান শত্রু ক্যান্সার। ফুসফুস, প্রোস্টেট, অন্ত্র, ত্বক ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্যান্সার বহু পুরুষের অকাল মৃত্যুর কারণ। ক্যান্সার ঝুঁকি কমানোর জন্য নীচের পদক্ষেপগুলি বেশ কার্যকরী ।
·         ধূমপান পরিহার করতে হবে। ধূমপান পরিহার করলে যেমন হৃদরোগের সম্ভাবনা কমে, তেমন ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমে। এমন কি পরোক্ষ ধূমপান থেকে দূরে থাকলেও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।
·         ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। অতিরিক্ত ওজন কমাতে পারলে নানা ধরণের ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো যায়।
·         ব্যায়াম করতে হবে। নিয়মিত শরীর চর্চা ওজন কমাতে সাহায্য করে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং একই ভাবে ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমায়।
·         প্রচুর শাক-সবজী এবং ফলমূল খেতে হবে। শাক-সবজী এবং ফলমূল ক্যান্সার প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকরী।
·         সূর্যের আলো থেকে সুরক্ষিত থাকতে হবে। অতিরিক্ত সৌরালোক ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। সূর্যের আলোতে অতিরিক্ত ঘোরাঘুরি করলে অবশ্যই সানস্ক্রিন (Sunscreen) বা সূর্যালোক সুরক্ষাকারী ক্রিম ব্যাবহার করতে হবে কিংবা ছাতা ব্যবহার করা উচিত।
·         মদ্যপান সীমিত করতে হবে। অতিরিক্ত মদ্যপান করলে অন্ত্র, ফুসফুস, কিডনি, যকৃত ইত্যাদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অতএব মদ্যপান পরিহার করলে এটা প্রতিরোধ করা যায়।
·         ক্যান্সার শনাক্তকারী পরীক্ষা-নিরীক্ষা । কিছু-কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সুপ্তাবস্থায় বা প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্ত করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্ত করা গেলে তার চিকিৎসা করা যায়।  এজন্য প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। 

৩। দুর্ঘটনা

মোটর যানবাহন দুর্ঘটনা পুরুষদের মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। পথঘাটে চলাফেরার সময়ে সতর্ক থাকতে হবে। যানবাহন ব্যবহারের সময়  মাথায় হেলমেট পরা এবং সিট বেল্ট বাঁধা গুরুত্বপূর্ণ। মদ্য পান কিংবা নেশাগ্রস্থ অবস্থায় যানবাহন চালনা কর উচিত নয়।

৪। ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী অবরোধাত্মক ব্যাধি

ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী রোগে অনেক পুরুষের স্বাস্থ্যহানি হয়ে থাকে।  বিশেষত ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস এবং পালমোনারি এমফিসিমায় অনেক পুরুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে থাকে। এজন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিতঃ

  • ধূমপান পরিহার করতে হবে। ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী রোগের প্রধান কারণ ধূমপান। ধূমপান পরিহার করলে এর থেকে মুক্ত থাকা সহজ হয়।
  • বায়ূ দূষণ পরিহার করতে হবে। ধুলাবালি ধোঁয়ামুক্ত পরিবেশ এড়িয়ে চলতে  হবে।
  • শ্বাসনালীর সংক্রমন প্রতিরোধ করতে হবে। ঘন ঘন শ্বাসনালীর সংক্রমন ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়। অতএব শ্বাসনালীর সংক্রমন থেকে মুক্ত থাকার জন্য সতর্ক থাকতে হবে।

 ৫। মস্তিস্কের পক্ষাঘাত বা স্ট্রোক

মস্তিস্কের পক্ষাঘাতের অনেক ঝুঁকি উপাদান আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যেমন- বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, জাতি ইত্যাদি। কিন্তু কতগুলি উপাদান আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। যেমন-
  • ক্রনিক রোগসমূহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ইত্যাদি পক্ষাঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা পক্ষাঘাত প্রতিরোধের জন্য জরুরী।
  • ধূমপান পরিহার করতে হবে। অতিরিক্ত ধূমপান পক্ষাঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।  কিন্তু ধূমপান পরিহার করে পক্ষাঘাতের সংখ্যা কমানো সম্ভব।
  • মদ্যপান পরিহার করতে হবে। অতিরিক্ত মদ্যপানেও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। সুতরাং মদপান পরিহার করলেও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে।  

৬। ডায়াবেটিস

ডায়াবেটিস বিশেষত টাইপ-২ ডায়াবেটিস  থাকলে শরীরে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের ফলে হৃদরোগ, স্নায়ু রোগ, কিডনির সমস্যা, চোখের রেটিনার সমস্যা এবং আরও অনেক জটিলতা হয়।এজন্য ডায়াবেটিস  নিয়ন্ত্রণে রাখা সুস্থ থাকার জন্য জরুরী। এজন্য-
·         নিয়মিত জীবনাচরণ মেনে চলতে হবে
·         স্বাস্থ্যকর সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে
·         নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে
·         অতিরিক্ত ওজন কমাতে হবে।

৭। আত্মহত্যা

পুরুষের স্বাস্থ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা আত্মহত্যার প্রবণতা। সাধারণত বিষণ্ণতা থেকে আত্মহত্যার ইচ্ছা জাগে। কারও বিষন্নতার লক্ষণ-উপসর্গ দেখা গেলে অবশ্যই তার চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে বিষণ্ণতা দূর করার মাধ্যমে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সবশেষে বলতে হয় স্বাস্থ্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা সহজ; কিন্তু প্রতিরোধের পদক্ষেপ গ্রহণ করা সহজ নয়। তবে সবক্ষেত্রে পুরুষদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল সূত্রটি একই; আর তা হচ্ছে স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম ও শরীর চর্চা করা, ধূমপান পরিহার করা, মদ্যপান না করা এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো।এর সুফল আমরা যা মনে করি, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশী।